ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিব ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

মঙ্গলবার   ১০ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৬ ১৪২৬   ১২ রবিউস সানি ১৪৪১

রাত হলেই লাল রঙা বাড়ির ছাদে হেঁটে বেড়ায় অশরীরী ছায়া!

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ নভেম্বর ২০১৯  

লাল রঙা প্রাচীন একটি বাড়ি। অত্যন্ত সুন্দর হলেও বাড়িটির দিকে তাকালেই গা ছমছমে একটা ভাব হতেই পারে! এই বাড়ির নাম রাইটার্স বিল্ডিং। ২৩৩ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে মধ্য কলকাতায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক সেই লালবাড়িটি। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির শাসনকাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মহাকরণ হয়ে ওঠা রাইটার্স বিল্ডিং তার পুরনো ইটের আনাচে-কানাচে বয়ে নিয়ে চলছে পুরনো তিলোত্তমার নানা ইতিহাস। 

এই লাল রঙা বাড়িতেই নানান ব্যাখ্যাহীন ঘটনা ঘটেছে এবং এখনো ঘটে চলেছে। দীর্ঘদিন যাবত কলকাতায় বসবাস করছেন এমন মানুষের মুখে এই বিল্ডিং সম্পর্কে নানান কথা প্রচলিত আছে। অনেকেই নাকি নিজ চোখে এখানে ভূত দেখেছেন। তবে সেখানে ভূত আছে কি নেই- সেই প্রশ্নে না গিয়ে বরং প্রচলিত অতিপ্রাকৃত এবং ব্যাখ্যাহীন ঘটনা সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক-

রাইটার্স বিল্ডিং কেন বানানো হয়েছিল?

মূলত কলকাতার স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মচারীদের জন্য ব্রিটিশ আমলে বানানো হয় এই রাইটার্স বিল্ডিং। তবে বিল্ডিংটি ছিল কর্মচারীদের তুলনায় অনেক বেশি বড়। এমনকি জানা যায়, এখানে এমন বহু ঘর হয়েছে যেগুলো কখনো খোলা হয়নি, খোলার প্রয়োজনও হয়নি। অনেকের ভাষ্যমতে, প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অনেক অনৈতিক কাজও হতো এখানে। ব্রিটিশরা সে সময়কার প্রতিবাদী স্থানীয় ব্যাক্তিদের এখানে ধরে এনে অত্যাচার করতো। এমনকি মেরে ফেলতো। কথায় আছে, ব্রিটিশদের এসব অত্যাচারের কাহিনী নাকি মহাকরণের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতো।

 

ঐতিহাসিক লাল রঙা বাড়ি

ঐতিহাসিক লাল রঙা বাড়ি

কখন থেকে ভুতুড়ে কর্মকান্ড শুরু হলো?

ব্রিটিশদের নিপীড়নে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের আত্মা নাকি স্থানটি ছেড়ে কখনো যায়নি। ফলে প্রশাসনিক ভবন হিসেবে চালু করার পর থেকেই এখানে নানান অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটতে থাকে। বিশেষ করে নবান্ন শুরু হওয়ার ঠিক আগে প্রতিবছর এই ভবনে শুরু হয়ে যেত নানান রহস্যজনক ঘটনা। হঠাৎ করেই চিৎকার ভেসে আসা, হঠাৎ করে বিল্ডিং এর সব লাইট একসঙ্গে নিভে যাওয়া আবার জ্বলে ওঠা, বিল্ডিং জুড়ে গমগম শব্দ হওয়া, হঠাৎ করে প্রচন্ড শীত অনুভূত হওয়া- এমন নানান ঘটনা ঘটতো এই বিল্ডিং এ। 

এসব কারণে সন্ধ্যার পর থেকে এখানে আর কেউই কাজ করতে চাইতেন না। এই ভবনের আশেপাশে যাদের বাড়ি, তাদের মতে, এখনো মাঝেমধ্যেই নাকি রায়টার্স বিল্ডিং থেকে হাড় হিম করা শব্দ শোনা যায়। এই স্থানে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা একজন নৈশপ্রহরী জানান-

‘রাত নামলে রাইটার্স বিল্ডিং এর জনশূন্য অলিন্দ যেন হয়ে ওঠে অশরীরীদের আখড়া। এই রাইটার্স বিল্ডিংয়ের পাঁচ নম্বর ব্লকটি মোটেই সুবিধার স্থান নয়। রাত নামতেই এখানকার বারান্দা দিয়ে কারা যেন হেঁটে বেড়ায়। দৌড়ে গিয়েও দেখা যায় না কাউকেই। এখানকার ঘরগুলো থেকে শোনা যায় একটানা টাইপের আওয়াজ। দোতলায় কারা যেন ভেসে উঠে মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়’।

 

পাঁচতলা বাড়িটির উপরেই রাত হলে হেঁটে বেড়ায় বিভিন্ন ছায়া

পাঁচতলা বাড়িটির উপরেই রাত হলে হেঁটে বেড়ায় বিভিন্ন ছায়া

কীভাবে রাইটার্স বিল্ডিং ভুতুড়ে স্থানে পরিণত হলো?

১৮ শতকের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এখানেই একসময় ছিল কুখ্যাত সেই কলাগাছের জঙ্গল যেখানে ব্রিটিশরা অনেক সাধারণ মানুষকে মেরে পুতে রেখেছিল। একবার বেশ কয়েকজন ইংরেজকে এখানেই কবর দেয়া হয়েছিল বলেও জানা যায়। লর্ড ভ্যালেনটিনের তথ্য মতে, ওয়েস্টার্ন অঞ্চলের মতো ঘোড়ায় টানা গাড়ির খেলা বা ডুয়েল (বন্দুকযুদ্ধ) চলত এই এলাকায়। হর হামেশা লেগে থাকত খুন-জখমের মত ঘটনা। 

এমন বহু ঘটনার কথা আজো এই এলাকায় মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল এখানে- বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় বিনয়-বাদল-দীনেশের মত স্বাধীনতাকামী সৈনিকদের হাতে কর্ণেল সিমসন খুন হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে খোদ এই সরকারি দফতরটিতে অশরীরীদের অস্তিত্ব আজো অস্বীকার করতে পারেন না কেউই।

ইতিহাসের পাতায় রয়টার্স বিল্ডিং

 

বিশালাকার এই বাড়িটি ইতিহাসের সাক্ষী

বিশালাকার এই বাড়িটি ইতিহাসের সাক্ষী

সালটা ১৭৭০। ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংসের নকশা প্রস্তুত করেছিলেন টমাস লায়ন্স। ১৭৭৬ সালে বাংলায় ব্রিটিশদের প্রকৃত শাসন শুরু হলে কোম্পানির করণিক বা রাইটারদের কাজ বহুবিধ হয়ে যায়। ফলে তাদেরকে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে একিভূত করতে গভর্ণর ওয়ারেন হেস্টিংস একটি নতুন কাঠামো নির্ধারণ করেন। তখন কেরানিদের বলা হত রাইটার্সর। আর তাদের নাম থেকেই এই ভবনটির নাম হয়ে যায় ‘রাইটার্স বিল্ডিং’।

প্রথম পর্বে ১৭৭৬ থেকে ১৭৮০ পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছিল শুধুমাত্র মেইন ব্লকটি। ১৭ বিঘা জমিতে কোম্পানির সিভিল সার্ভেন্টদের থাকার জন্য ১৯টি একই রকম দেখতে অ্যাপার্টমেন্ট গড়ে তোলা হয়। তবে, ১৮০০ সাল পর্যন্ত এ ভবন কোম্পানির করণিকদের আবাসিক ভবনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ভবনের একাংশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কার্যক্রম শুরু হলে রাইটারদের বাসস্থান স্থানান্তর করা হয়।

এরপর রাইটার্স বিল্ডিং ব্রিটিশ উপনিবেশিক রাষ্ট্রের সচিবালয়ে পরিণত হয় এবং উপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রয়োজনের তাগিদে ভবনের পরিসরে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ভবন সম্প্রসারণের কাজ সবচেয়ে বেশি হয় ১৮২১, ১৮৩০, ১৮৭১-১৮৮২ এবং ১৮৭৯ সালে। প্রত্যেকবারই মূল ভবনের সঙ্গে নতুন নতুন অঙ্গ সংযুক্ত হয়ে রাইটার্স বিল্ডিং তার বর্তমান কাঠামো ধারণ করেছে।

 

সন্ধ্যা হলেই গা ছমছমে ভাব হয় বাড়িটির দিকে তাকালে

সন্ধ্যা হলেই গা ছমছমে ভাব হয় বাড়িটির দিকে তাকালে

প্রাচীন এই লাল রঙা ভবনটি স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু উত্থানপতনের সাক্ষী। ১৯৩০ সালের ৮ নভেম্বর বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত রাইটার্স বিল্ডিংসে এক দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে কারাবিভাগের প্রধান অত্যাচারী ইংরেজ অফিসার এন.জি. সিম্পসনকে হত্যা করেন। এই ঘটনার পরে ভবনের অলিন্দে নিরাপত্তারক্ষী ও কমিশনার টেগার্টের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে বিপ্লবী-ত্রয়ীর যে সংঘর্ষ হয় তা ইতিহাসে ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে প্রসিদ্ধ। 

এরপর ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতালাভের পর রাইটার্স বিল্ডিংস পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্য সচিবালয়ে পরিণত হয়। এইসময় বাংলায় ভবনটির নামকরণ করা হয় ‘মহাকরণ’। যদিও ইংরেজি নাম হিসেবে ‘রাইটার্স বিল্ডিংস’ কথাটিই কালব্যবধানে আজো প্রচলিত। দীর্ঘকাল মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহাফেজখানাসহ রাজ্য সরকারের একাধিক সরকারি বিভাগের প্রধান কার্যালয় মহাকরণে অবস্থিত ছিল। এরপর স্বাধীন ভারতের আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রভাব, লাল ফিতার দৌরাত্ব এবং দূর্নীতির উৎসের বহু সাক্ষী হয়ে আছে মহাকরণের লবি।

রাইটার্স বিল্ডিং এর বর্তমান হালচাল

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে দীর্ঘদিন ধরে রাইটার্স বিল্ডিং ছিল রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক কার্যালয়। তবে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য প্রশাসনিক দফতর হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে এটি। আগামী দিনে এই রাইটার্স বিল্ডিং যে আবার তার স্বমহিমায় ফিরে আসতে চলেছে, তার ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক দিন যাবত সংস্কারের কাজ চলছে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। আশা করা যায়, এই আধুনিকায়নের মাধ্যমে ভবন থেকে চিরতরে বিদায় নেবে ইতিহাসের কালো অধ্যায়।

দৈনিক কিশোরগঞ্জ
দৈনিক কিশোরগঞ্জ