ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিব ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’
  • শনিবার   ৩০ মে ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৬ ১৪২৭

  • || ০৮ শাওয়াল ১৪৪১

দৈনিক কিশোরগঞ্জ
৫৮

জামিন চাইছে না উচ্ছ্বসিত কারাবন্দিরা!

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০২০  

মুজিববর্ষ উপলক্ষে ১৮মার্চ থেকে কিশোরগঞ্জ কারাগারে কয়েদিদের নিয়ে শুরু হচ্ছে ফুটবল লিগ। এ আয়োজনে বন্দিরা এতটাই উচ্ছ্বসিত যে তাদের অনেকে টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জামিনে মুক্ত হতে চাইছে না। বিশেষ করে তরুণ বন্দিদের মধ্যে চলছে উৎসবের আমেজ। তারা তাদের স্বজনদের বলে দিচ্ছে ২৭ মার্চের আগে যেন জামিন আবেদন না করে। কারণ ২৭ মার্চ টুনার্মেন্টের ফাইনাল খেলা হবে। এই তথ্যগুলো জানালেন জেল সুপার মো. বজলুর রশিদ। তিনি জানান, টুর্নামেন্টের জন্য বন্দিদের নিয়ে ছয়টি দল গঠন করা হয়েছে। তাদের ফুটবলের নিয়ম-কানুন শেখানোসহ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কারাগারের ভেতরে যে বিশাল মাঠটি রয়েছে, সেখানে অনুষ্ঠিত হবে টুর্নামেন্ট।

এক সময় ডাকাত ছিলেন কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার মৃগা গ্রামের বিল্লাল মিয়া। আট মাস কারাগারে ছিলেন। গলা ভালো বলে কারাগারে তাঁকে গানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি এখন পেশাদার গায়ক। অপরাধ জগতকে ঘৃণা করেন এখন। বিল্লাল বলেন, এটি কারাগার নয়, মানুষ গড়ার কারখানা। এখানে এসে আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। আগে পরিবারসহ সমাজের লোকজন আমাকে ঘৃণা করত। এখন সবাই ভালোবাসে।

বিল্লালের মতো আবারো মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে কিশোরগঞ্জ কারগারের শত শত বন্দি। জেলা প্রশাসনের একটি উদ্যোগ সেই স্বপ্ন দেখাচ্ছে তাদের। স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে কারাভোগের সঙ্গে চলছে নতুন দিনের প্রস্তুতি।

কারাগারের ভেতরে তাদের জন্য তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ স্কুল। যেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষকর্মী হয়ে উঠছেন কয়েদীরা। মুক্তির পর তারা কোথায় কাজ করবেন, তা-ও রাখা হয়েছে ঠিক করে। আর এভাবে একটি আদর্শ সংশোধনাগারে পরিণত হয়েছে কারাগারটি। ইতোমধ্যে কারাগারে সুর তরঙ্গ নামে সংগীত বিদ্যালয় চালু হয়েছে। বিদ্যালয়ে প্রতিদিন গানের আসর বসে। রয়েছে জুতা তৈরির কারখানা, যেখানে বন্দিদের হাত হয়ে উঠছে কর্মীর হাত। কারাগার প্রাঙ্গণে বিশাল কৃষিখামারে চলছে বিভিন্ন ধরণের সবজিচাষ। কিছুদিনের মধ্যে চালু হবে বেকারি, যেখানে তৈরি হবে উন্নতমানে রুটি-বিস্কুট। চিত্তবিনোদনের জন্য হাতে নেওয়া হয়েছে খেলাধুলাসহ আরও নানা উদ্যোগ।

সূত্র জানায়, গত বছর কিশোরগঞ্জ সফরে গেলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে কারাগারের কারখানায় প্রস্তুত একজোড়া জুতা উপহার দেওয়া হয়। তিনি এ জুতা পেয়ে খুব খুশি হন। জেলা প্রশাসন এই ব্যতিক্রম উদ্যোগটির দাপ্তরির নাম দিয়েছে, ‘কিশোরগঞ্জ করাবন্দি সংশোধনাগার মডেল।’

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্দিষ্ট শাস্তি ভোগ শেষে অপরাধীরা অনেক সময় সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায় না। আগের অপরাধ-জীবন নতুন পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বেকারত্বের কারণে আবার অনেকে অপরাধে পা বাড়ায়। তখন প্রশিক্ষণ কোনো কাজে লাগে না। তাই বন্দিকালীন সময়ে প্রশিক্ষণ ও মুক্তির পর পুনর্বাসন কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছেন তারা। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি কমিটি সর্বক্ষণিক এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছে।

জেলা সুপার মো. বজলুর রশীদ জানান, ১৯৪৮ সালে শহরের বটতলায় মহকুমা কারাগারের যাত্রা শুরু হয়। কারাগারটি ছোট হওয়ায় জায়গার অভাবে বন্দিদের কল্যাণে তেমন কিছু করা যাচ্ছিল না। গতবছর শহরতলীর খিলপাড়ায় ২৮ একর ভূমির ওপর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নবনির্মিত নতুন জেলা কারাগার চালু হয়। এর ফলে সুযোগ তৈরি হয় নতুন কিছু করার।

কারা সূত্র জানায়, যারা বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যাচ্ছে। তাদের এ কর্মসূচিতে যুক্ত করা হচ্ছে। সেখানে সাত দিন থেকে শুরু দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে নয়টি ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ স্কুল। ট্রেডগুলো হলো, কৃষি, সেলাই, জুতা তৈরি, নার্সারি, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা, মাছ চাষ, রন্ধন ও রেস্তোরাঁ ব্যবস্থাপনা, সংস্কৃতি চর্চা ও ক্রীড়া চর্চা।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কর্মাস, জেলার বৃহত্তম একটি ফুড কোম্পানি, গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান, জুতা কম্পানিসহ দেশের একটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান কারামুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েদিদের চাকরি দেবে। এছাড়া যারা নিজে স্বাবলম্বী হতে চাইবে তাদের জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে। দেবে ঋণ সহায়তাও।

তাছাড়া আরও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এতে যুক্ত করা হবে বলেও জনা গেছে।

পুরো উদ্যোগ সম্পর্কে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বললেন, এটি স্থানীয়ভাবে নেওয়া জেলা প্রশাসনের একটি উদ্যোগ। যাতে কারা কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করছে। কিশোরগঞ্জ কারাগার যেন সত্যিকার অর্থে সংশোধনাগারে পরিণত হয় সে লক্ষে কাজ করছি আমরা। যার মাধ্যমে করামুক্তদের সৎকর্ম, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ও অপরাধী থেকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর নিশ্চিত করতে চাই। আমরা এরইমধ্যে এ উদ্যোগের সুফল পেতে শুরু করেছি। আমি মনে করি কারাগার ভীতিকর জায়গা না হয়ে প্রকৃত অর্থে সংশোধনাগার হওয়া উচিত। কিশোরগঞ্জে আমরা সেই লক্ষ নিয়ে কাজ করছি।