ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিব ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’
  • শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২৬ ১৪২৭

  • || ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪১

দৈনিক কিশোরগঞ্জ
৫২

জরুরি হলেও সুযোগ কম পরীক্ষার

নিজস্ব ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২০  

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, করোনা ভাইরাস মোকাবিলার মূল পথ হচ্ছে- সংক্রমণ শনাক্ত করে তাদের বিচ্ছিন্ন করা। সেই সঙ্গে সংক্রমিতরা যাদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টিনে রাখা। সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রস আধানম গেব্রিয়েসুস গত ১৬ মার্চ সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেছেন, ‘করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের শনাক্ত করতে অনেক দেশই যথেষ্ট পরীক্ষা করছে না। তাই সব দেশের প্রতি আমাদের বলার বিষয় হচ্ছে- পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা।

করোনা আক্রান্ত হিসেবে কাউকে সন্দেহ হলে প্রথমেই পরীক্ষা করতে হবে।’ তবে ডব্লিউএইচও কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেনি। তবে জনঘনত্ব ও মানুষের জীবনযাপনের ধরন বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ টেস্টিং কিটের স্বল্পতা, ল্যাবরেটরি ও জনবল সংকটের কারণে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি (কোভিড-১৯) শনাক্তকরণ পরীক্ষা কম হচ্ছে। তাই যেসব রোগী এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে, তার বাইরেও দেশে আক্রান্ত রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

দেশে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার একক ও একমাত্র সেন্টার হচ্ছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। প্রায় ১৭ কোটি লোকের এ দেশে কারও মধ্যে ভাইরাসটির লক্ষণ দেখা গেলে ওই প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কিছু নম্বরে ফোন করতে হয়। কিন্তু প্রতিদিন যত মানুষ উপসর্গের বিষয়ে আইইডিসিআরে ফোন করছেন, সে পরিমাণ পরীক্ষা করা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞ

চিকিৎসকদের দাবি, আইইডিসিআর ছাড়া আর কোথাও করোনা ভাইরাসের পরীক্ষার সুযোগ নেই। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কিট ও জনবল সংকট এবং সারাদেশে ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটি না থাকায় এমনটি হচ্ছে। আবার সরকারের এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি হাতেগোনা

কিছু রোগী ছাড়া পরীক্ষা করছে না। তাই দেশে এখন আক্রান্তের সংখ্যা বেশি না কম, সেটি বলা মুশকিল। ফলে করোনার শনাক্ত রোগীর বাইরেও স্থানীয় পর্য়ায়ে রোগী রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ‘কারও মধ্যে লক্ষণ দেখা গেলেই পরীক্ষা করতে হবে। সংক্রমিত হলে তাকে আলাদা করতে হবে এবং তিনি যাদের সংস্পর্শে গেছেন তাদেরও পরীক্ষা করে আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। এটিই হচ্ছে ভাইরাসটির ব্যাপক সংক্রমণ ঠেকানোর পথ। কিন্তু আমাদের দেশে এটি হচ্ছে না। তা ছাড়া পরীক্ষা হচ্ছে শুধু আইইডিসিআরে। একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে মহাবিপদ হতে পারে। কেননা সামনে পরিস্থিতি খারাপ হলে এ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।’

জানা গেছে, আইইডিসিআরের কাছে করোনা পরীক্ষার কিট ছিল ২ হাজার। গত ১৭ মার্চ পর্যন্ত পরীক্ষা শেষে মজুদ ছিল ১ হাজার ৭৩২টি। এর মধ্যে অবশ্য চীনসহ কয়েকটি দেশের কাছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিট চেয়েছে। আশ্বাসও এসেছে। কিন্তু নতুন কিট কবে পাওয়া যাবে, আর এর আগেই যদি ভাইরাসটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পরীক্ষার ব্যবস্থা কী হবে।

এ কারণে কেউ আইইডিসিআরে ফোন করলে, পরীক্ষাকে গুরুত্ব কম দিয়ে তাকে আলাদা থাকার পরামর্শ দিচ্ছে। ফোনদাতাকে মূলত দুটি প্রশ্ন করা হয়- প্রথমত সম্ভাব্য আক্রান্ত ব্যক্তি বিদেশ থেকে এসেছেন কিনা। দ্বিতীয়ত বিদেশ থেকে আসা কারও সংস্পর্শে এসেছেন কিনা। এর ওপর ভিত্তি করেই পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এসব প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে গেলে নিশ্চিতভাবেই বিপদে পড়তে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেননা সম্প্রতি যারা সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রবাসীদের সংস্পর্শে আসা স্থানীয় ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তারা সংক্রমিত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আগে স্থানীয় আরও কতজনকে সংক্রমিত করে গেছেন, তা কিন্তু অজানা থেকে যাচ্ছে। ফলে সরাসরি প্রবাসী বা বিদেশ থেকে আসা কারও সংস্পর্শে না এসেও অনেকে সংক্রমিত হচ্ছেন। রাজধানীর টোলারবাগে যে বৃদ্ধ মারা গেছেন, তিনিও কোনো বিদেশির সংস্পর্শে যাননি। তার ঘনিষ্ঠ একজনেরও মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার বাইরেও মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যাদের নমুনা সংগ্রহ করছে আইইডিসিআর।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা করোনা টেস্ট এক জায়গা না রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। এটি এক জায়গা রাখা যাবে না। ঢাকায় আরও সেন্টার বাড়াতে হবে।’ এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, বর্তমানে তাদের কাছে ২০ হাজারের বেশি কিট রয়েছে। আরও এক লাখ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এক কর্মকর্তা জানান, তিনি সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হওয়ায় আইইডিসিআরের হটলাইনে একাধিকবার ফোন করেও সংযোগ পাননি। পরে তিনি নিজেই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেতে শুরু করেন। বিদেশি কারও সংস্পর্শে না গেলেও এ কর্মকর্তা সম্প্রতি ভাতিজির বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন বলে জানান। তাই এবারের সর্দি ও কাশি নিয়ে তার কিছুটা শঙ্কা তৈরি হওয়ায় করোনার পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এর আগেও তার এক আত্মীয়ের করোনার উপসর্গ দেখা দিলে তিনি আইইডিসিআরে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কখনো তিনি ফোন ব্যস্ত পেয়েছেন আবার কখনো রিং হলেও রিসিভ হয়নি বলে তার অভিযোগ। বিএসএমএমইউয়ের এ কর্মকর্তাই নয়, এ অভিযোগটা অনেকেরই। আবার ফোন ধরা হলেও পরীক্ষা না করিয়ে, বাসায় আলাদা থাকার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব সেরেছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন হাতেগোনা কিছু রোগীর পরীক্ষা হয়ে থাকে, যা ফোন করা রোগীর ১ শতাংশও কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, সর্দি-জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও গলাব্যথাসহ করোনা ভাইরাসের লক্ষণ থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের হটলাইনে কল করেছেন ৩৬ হাজার ৭৬৮ জন। এর মধ্যে স্বাস্থ্য বাতায়নÑ ১৬২৬৩ নম্বরে ৩২ হাজার ৬৯৩ জন, ৩৩৩ নম্বরে ২ হাজার ৩৬৪ এবং আইইডিসিআরে নম্বরে ১ হাজার ৭১৬ জন রয়েছেন। অথচ গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫৬ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ছয়জনের করোনা ভাইরাস পজিটিভ হয়েছে। আর এ পর্যন্ত দেশে ৬২০ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩৩ জনের মধ্যে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এ মৌসুমে সাধারণ ফ্লুর কারণে হাঁচি, কাশি, সর্দি, জ্বরের রোগীর সংখ্যা এমনি বেশি থাকে। এসবের সঙ্গে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গের মিল থাকায় অনেক রোগী আতঙ্কিত হচ্ছেন। তারা করোনার পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন। কিন্তু পরীক্ষা করতে না পারায় অনেকের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আর বিদেশ ফেরত কিংবা তাদের সংস্পর্শে আসা লোকজনকে পরীক্ষা করলেই হবে না। কারণ বিদেশ থেকে আসা মানুষগুলো এক জায়গায় ছিলেন না। তারা পরিবার, আত্মীয়স্বজন বাইরেও হাটবাজার, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেছেন। যদি কারও মধ্যে ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে থাকে, তা হলে তার মাধ্যমে অন্যরাও সংক্রমিত হয়েছেন। তাই এখন স্থানীয়দের মধ্যে যাদের করোনার লক্ষণ-উপসর্গ আছে, তাদেরও পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তা না হলে বিপদ আরও ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করতে পারে।’

আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা দেখছি করোনা টেস্ট এক জায়গায় সীমাবদ্ধ। এটি আরও কয়েকটি জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকার কেন সেটি করছে না। হাতেগোনা কিছু মানুষের পরীক্ষা করে এটি কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়ায়নি বলে বসে থাকলে বিপদ বাড়তে পারে। লক্ষণ দেখে সবাইকে পরীক্ষা করে যদি দেখা যায়, এটি কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়ায়নি, সেটি আমাদের জন্য ভালো খবর।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টেস্ট বাড়ানোর কথা বলেছে- এটি ঠিক। কখন টেস্ট করতে হবে, সেটিও ডব্লিউএইচও জানিয়েছে। সে অনুযায়ীই আমরা কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ সেন্টার বাড়ানো প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশের কোথায় তা চালু করতে হবে তা নির্ধারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) নাসিমা সুলতানাকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘করোনা ভাইরাসে সন্দেহভাজনদের কেবল আইইডিসিআরে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে আটটি মেশিনে পরীক্ষা চলছে। নতুন আরও সাতটি মেশিন নিয়ে এসেছি। এগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হবে। তবে রাতারাতি সেটি সম্ভব নয়। কারণ মেশিন স্থাপনে ল্যাবরেটরি করতে হবে। এখন সেই কাজ চলছে।’

শিক্ষা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর