ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিব ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

সোমবার   ২০ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ৬ ১৪২৬   ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

৯১৭

ফ্যাশন-স্টাইল

কালো মেয়ে

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ ডিসেম্বর ২০১৮  

কৃষ্ণকলি’ বলে ডাকলেই কি কালো মেয়েটার দুঃখ হরণ হয়?

নামের সাথে সেই তো কৃষ্ণ অর্থাৎ কালো শব্দটা জুড়েই দেওয়া। কবি কিন্তু এখানে গায়ের কালো রঙ দেখে মুগ্ধ হননি, মুগ্ধ হয়েছেন মেয়েটার কালো হরিণ চোখ দেখে। অর্থাৎ কালো মেয়েও কবিতার বিষয় হতে পারে যদি তার থাকে হরিণের মত টানা টানা দুটি চোখ।

কিন্তু সাথীর না আছে হরিণের মত টানা টানা দুই চোখ, না আছে মেঘ বরণ কেশ। নাক বোঁচা, ছোট চোখের সাথীর চেহারায় ঢলঢল লাবণ্য নজর কাড়লেও তাকে প্রায়ই শুনতে হয় সে কালো তাই তার বিয়ে হবে না। দশম শ্রেণিতে পড়া সাথী বান্ধবীদের সাথে কথায় কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ে। যতক্ষণ স্কুলে থাকে ততক্ষণই ভালো লাগে তার। বাসায় থাকলে হয় দাদী না হয় মা কিংবা প্রতিবেশী কারও না কারও কাছে নিজের গায়ের রঙ নিয়ে খোঁটা শোনে সে। প্রতিবেশীরা কত পরামর্শ দেয়। এই ক্রিম সেই ক্রিম মাখতে বলে। দাদী তাকে রোজ হলুদের রস দুধে মিশিয়ে খাওয়ায় যদি মেয়েটার রঙ ফেরে!

শপিং করতে দারুণ লাগে সাথীর কিন্তু সে শপিং এ যেতে চায় না। কারণ সেখানে গেলে তাকে শুনতে হয় ‘এই রঙে মানাবে না তোমাকে’ ‘এই ডিজাইন তোমার জন্য নয়’। হলুদ রঙ খুব প্রিয় হলেও কখনও হলুদ রঙের কোন জামা পরতে পারেনি সাথী। মাঝেমধ্যে একা বাসায় মায়ের হলুদ শাড়ি শরীরে পেঁচিয়ে দেখে তাকে কেমন লাগে! নিজেকে তার ভালোই লাগে কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন হলুদ জামা পরা হয়নি তার। সব জামাই ঘুরে ফিরে হালকা গোলাপি, হালকা সবুজ, হালকা বেগুনি অর্থাৎ হালকার যত শেড আছে সব।

নিজের গাঁয়ের রঙ কেমন হবে তার উপর আমাদের কোন হাত থাকে না কিন্তু সাথীর মত কালো মেয়েদের জীবনের সব রঙ শৈশবেই শুষে নেওয়া হয় তার গায়ের রঙ কালো হওয়ার অপরাধে।

আহারে মেয়েটা যেমন লম্বা তেমনি টানা টানা চোখ মুখ কিন্তু গায়ের রঙ তো কালো, কে বিয়ে করবে ওকে?

মেয়েটার চোখগুলো সুন্দর কিন্তু গায়ের রঙ কালো।

মেয়েটা কালো হলেও চুলগুলো খুব সিল্কী।

যেমন কালো তেমনি মোটা কোন ছেলে পছন্দ করবে ওকে?

আশপাশে শোনা যায় প্রায়ই। কিন্তু এসব যারা বলি তারা একবারও ভাবি না কথাটার মাঝে কতখানি শ্লেষ মিশে আছে। কারণ গায়ের রঙ ফর্সা এমন কাউকে শুনতে হয়না যে গায়ের রঙ ফর্সা কিন্তু নাকটা বোঁচা। অন্তত নাক বোঁচা হওয়ার কারণে কোন মেয়ের সৌন্দর্য কম হয় না। গায়ের রঙ সাদা হলেই যেন কোন মেয়ের আর কোন যোগ্যতা অর্জন করা লাগে না।

অন্যদিকে যার গায়ের রঙ কালো তাকে কত করুণা, কত অবহেলা, কত অপমানের বাণী যে শুনতে হয় তা শুধুমাত্র সেই জানে।

গায়ের রঙের কারণে মানুষকে বিচার করার শুরুটা কীভাবে? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মানস চৌধুরী বলেন, উপনিবেশের কাল থেকে কালো রঙকে খাটো করে দেখার প্রবণতা শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। শুধু কালো মেয়ে নয় কালো মানুষদের দিকেই কিছুটা বিদ্বেষের সাথে তাকানো হয়। তিনি বলেন বাংলাদেশে এখনও কালোদের প্রতি বর্ণ বিদ্বেষ এতটাই তীব্র যে ঢাকার রাস্তায় কোন আফ্রিকান কালো মানুষ হেঁটে তার দিকে ঠিক যেন তিনশ বছর আগের ব্রিটিশদের মত ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকানো হয়। তার মতে ব্যাপারটা যেমন বেদনাদায়ক তেমনি কৌতুককরও কোন কোন ক্ষেত্রে।

গাঁয়ের রঙ কালো হওয়া যেন চলতে না পারা, চোখে না দেখা কিংবা কথা বলতে না পারার মত বিষয়। কালো মেয়েটি যেন সবার করুণার পাত্র। অথচ কোন মানুষই অন্যের করুণা নিয়ে বাঁচতে চায়না।

কালো রঙ যে একটা অযোগ্যতা এটা প্রচার করতে মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। যদিও এর সাথে বিজ্ঞাপনের স্বার্থই বেশি জড়িত। বিশ্বজুড়ে রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাবসা চলে মূলত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে লক্ষ্য করেই। বিজ্ঞাপনে একটা মেয়ের উচ্চশিক্ষা, বাইক চালানো কিংবা চাকরি বা ব্যবসা করার যোগ্যতা সবকিছুকে খাটো করে দেখানো হয় গায়ের রঙের কারণে। রূপকথার জাদুর ছোঁয়ার মত রঙ ফর্সাকারী ক্রিমকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখানো হয়। যতক্ষণ না সে ফর্সা হচ্ছে ততক্ষণ তার ভালো বিয়ে হচ্ছে না, সে ভালো চাকরি পাচ্ছে না, না পারছে নিজের পায়ে দাঁড়াতে।

বিজ্ঞাপনের ভাষায় যদিও তেল ময়লা পরিষ্কার করে উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু পণ্যের মোড়কে ঠিকই ফেয়ারনেস ক্রিম বা ফেয়ারনেস ফেশিয়াল ওয়াশ লেখাই থাকছে।

বিজ্ঞাপন নির্মাতা অমিতাভ রেজা এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে এখন আর প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে গায়ের রঙকে খাটো করে দেখানো হয়না। এখন নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অন্যদিকে বিজ্ঞাপনে ঘাম হয়, ময়লা হয় তাই এই ক্রিম মেখে উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনুন ধরণের কথা বলা হলেও ক্রিমের মোড়কের ছবিতে ঠিকই অপেক্ষাকৃত কালো তেকে ফর্সা- এমন মুখের ছবি থাকে। আবার বিজ্ঞাপনে যারা মডেল তাদেরকে অতিরিক্ত ফর্সা দেখানো হয়।

এ ধরণের মনোভাবের পেছনে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা ও আমাদের দীর্ঘদিন পরাধীন থাকাকে দায়ী করেন অমিতাভ রেজা। তিনি দাবি করেন, বিজ্ঞাপনে নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গায়ের রঙের সেই জায়গা থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ। এখন করা হচ্ছেনা আর যদি হয়ও তিনি এর ঘোর বিরোধী বলেও জানান।

এই বাংলাদেশেই কালো মেয়ে জন্মানোকে যুগের পর যুগ ধরে অভিশাপ ধরা হয়েছে। মেয়ে মানেই তাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে হবে। আর বিয়ের ক্ষেত্রে গায়ের রঙ কালো হওয়া একটা অযোগ্যতা। অনেক সময় চাকরির ক্ষেত্রেও মেয়েরা গায়ের রঙের জন্য সমস্যায় পড়েন।

 

দৈনিক কিশোরগঞ্জ
দৈনিক কিশোরগঞ্জ