ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিব ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’
  • রোববার   ০৯ আগস্ট ২০২০ ||

  • শ্রাবণ ২৫ ১৪২৭

  • || ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

দৈনিক কিশোরগঞ্জ
৬৭

আল্লাহ চান বান্দা যেন নিজের চেষ্টাটুকু করে

নিজস্ব ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮ এপ্রিল ২০২০  

বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে নভেল-১৯ করোনাভাইরাস। এ ভাইরাস ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে পড়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৮২ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যু বরণ করেছেন। একে আল্লাহর গজব হিসেবেই মনে করছেন ধর্মীয় প্রবক্তারা। 

কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিস এ কথাই প্রমাণ করে। তবে এ ভাইরাসে আমাদের করণীয় কি? আল্লাহর গজব মনে করে তাকদিরের ওপর ছেড়ে দেয়া নাকি পাশাপাশি সতর্কও থাকতে হবে? অনেকেই বিষয়টিকে শুধু তাকদিরের ওপর ছেড়ে দিয়ে অবহেলায় জীবন যাপন করছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন মসজিদে জামাত সীমাবদ্ধ করে দেয়ার পরও বিষয়টি মানতে নারাজ অনেক সরলমনা মানুষ। উল্টো তারা মসজিদেই ভীড় করছেন। তাকদিরের ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন সবকিছু। কিন্তু ইসলাম কী এ ধরণের তাকদিরে বিশ্বাস সমর্থণ করে? আসুন জেনে নিই এমন প্রেক্ষাপটে ইসলামের কর্মপন্থা।

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) একখণ্ড কাঠ হাতে নিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি তা দ্বারা জমিনে টোকা দিচ্ছিলেন। এরপর তিনি তাঁর মাথা উঠালেন। তখন তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার জান্নাত ও জাহান্নামের ঠিকানা পরিজ্ঞাত (নির্ণীত) নয়। তাঁরা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাহলে আমরা কাজ-কর্ম ছেড়ে কি ভরসা করে বসে থাকব না? তিনি বললেন, না, বরং আমল করতে থাকো। যাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তাই তার জন্য সহজ করা হয়েছে। এরপর তিনি তিলওয়াত করলেন, ‘সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকি হলে এবং যা উত্তম তা গ্রহণ করলে, আমি তার জন্য সুগম করে দেব সহজ পথ এবং কেউ কার্পণ্য করলে ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে, এবং যা উত্তম তা বর্জন করলে, তার জন্য আমি সুগম করে দেবো কঠোর পরিণামের পথ।’ (সূরা লাইল ৯২:৫-১০)।

আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত; একজন ব্যক্তি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আমার উট বেঁধে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, নাকি আমি ওটাকে না বেঁধে ছেড়ে রেখেই আল্লাহর ওপর ভরসা করব? তিনি (রাসূল সা.) বললেন, ‘ওটাকে বাঁধো এবং (এরপর আল্লাহর ওপর) ভরসা কর।’ (সুনান তিরমিযি, হাদিস: ২৫১৭, হাসান)।

যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বাকার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সঙ্গে নিয়ে মক্কা ত্যাগ করেন, যে ঊষালগ্নে, সেদিন তারা দুজনে একটা গুহার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পেছন থেকে শত্রু যখন একেবারে নাকের ডগায় চলে এলো, একেবারে গুহার মুখে, তখন ক্ষণিকের জন্য ভয় পেয়ে যান আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই বুঝি তারা আমাদের দেখে ফেললো’। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিউত্তরে যা বলেছিলেন, তা কোরআনে স্থান পেয়ে গেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘হতাশ হয়োনা। নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন’।

নবীজীর (সা.) ওপর ঘনিয়ে এসেছিলো এক ঘোরতর বিপদ। মক্কার মুশরিকেরা তাকে হত্যা করার পাঁয়তারা করছিলো। তখন, আল্লাহর নির্দেশে নবীজী এই বিপদ এড়াতে মক্কা ছেড়ে মদিনা অভিমুখে রওনা করেন। দেখুন, বিপদ থেকে বাঁচার জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কি কোনো তাওয়াক্কুল ছিলো না? তিনি কি ভেবেছেন, ‘আরে! আল্লাহ বাঁচালে আমাকে মক্কাতেই বাঁচাবেন। মারলে মক্কাতেই মারবেন। আমি মক্কা ছাড়বো কেনো?’ আর, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালাও কি তাকে দিয়ে এমনটা করিয়েছেন? না। তিনি বরং নবীজীকে (সা.) মক্কা ছেড়ে চলে যেতে বললেন। নবীজীর (সা.) তো তাকওয়ার কোনো ঘাটতি ছিলো না। তাওয়াক্কুলের কোনো কমতি ছিলো না। এমন ধারণা করাই পাপ হবে। তাহলে কেনো তাকে সেদিন মক্কা ছাড়তে হলো? অবশ্যই সতর্কতার অংশ হিসেবে। শত্রুর চোখ এড়াতে কেন তাকে গুহার মধ্যে আশ্রয় নিতে হলো? আল্লাহ তো চাইলে তাকে এমনিই বাঁচিয়ে দিতে পারতেন। এটাও সতর্কতা। এ হচ্ছে আল্লাহর নবী (সা.) এর শেখানো তাওয়াক্কুল। তাকদির ও তাওয়াক্কুল মানে এটা নয় অসতর্ক থেকে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করেই বসে থাকা। নবী (সা.) তাকদিরে বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলেছেন।

বিভিন্ন নবী রাসূলদের আমলেও তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি সতর্কতামূলক পদক্ষেপের উদাহরণ পাওয়া যায়। মুসা আলাইহিস সালামের কথাই ধরুন। পেছনে ফেরাউনের বিশাল সৈন্যবহর, আর সামনে কূল-কিনারাহীন লোহিত সাগর। এমতাবস্থায় ঘাবড়ে গেলো মূসা আলাইহিস সালামের সঙ্গীরা। ভাবলো, ‘এই বুঝি তারা আমাদের ধরে ফেললো’। তখন মুসা আলাইহিস সালাম শোনালেন অভয় বাণী। বললেন, ‘আল্লাহ সঙ্গে আছেন’। এমন মুহূর্তে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামকে কি করতে বললেন? তিনি মুসা আলাইহিস সালামকে বললেন, তার লাঠি দিয়ে পানিতে আঘাত করতে। মুসা আলাইহিস সালাম তা-ই করলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র দু’ভাগ হয়ে, তাতে তৈরি হয়ে গেলো একটি শুষ্ক রাস্তা। আচ্ছা, কেনোই বা মুসা আলাইহিস সালামকে লাঠি দিয়ে পানিতে আঘাত করতে হলো? আল্লাহ কি চাইলে এমনিতেই রাস্তা তৈরি করে দিতে পারেন না? কিন্তু না, আল্লাহ চান বান্দা যেন তার চেষ্টাটুকু করে। বাকিটা আল্লাহর হাতে।

নুহ আলাইহিস সালামের কথা স্মরণ করুন। যখন তার জাতি একেবারে অবাধ্য, উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠলো, যখন তাদের ওপর আল্লাহর আজাব অত্যাসন্ন হয়ে আসলো, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা নুহ আলাইহিস সালামকে বললেন, একটা নৌকা তৈরি করে নিতে। তার জাতির ওপরে যে ভয়ঙ্কর বন্যা আপতিত হবে, তা থেকে বাঁচার জন্যে তারা যেন সেই নৌকায় উঠে পড়ে। খেয়াল করুন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা কি চাইলে নুহ আলাইহিস সালামকে নৌকা বানানো ব্যতীতই সেই বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। কিন্তু, তিনি কেনো তাহলে নুহ আলাইহিস সালামকে নৌকা তৈরির আদেশ করেছিলেন? ওই যে, আল্লাহ চান বান্দা যেন তার নিজের চেষ্টাটুকু করে। সে যদি আন্তরিক হয়ে নিজের কাজটুকু করে ফেলে, সেটাকে সম্পূর্ণতা আল্লাহ দিয়ে দেন।

মারঈয়াম আলাইহাস সালামের কথা স্মরণ করা যায় এখানে। ঈসা আলাহিস সালামকে গর্ভে ধারণ করার পরে যখন তার প্রসববেদনা শুরু হয়, সেদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা তাকে একটা খেঁজুর গাছের ডাল ধরে নাড়া দিতে বলেছিলো। ডাল ধরে নাড়া দিলে খেঁজুর ঝরে পড়বে এবং ওই খেঁজুর তিনি খেতে পারবেন। দেখুন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা হুকুম করলে গাছ থেকে খেঁজুর কি এমনিই ঝরে পড়তো না মারঈইয়াম আলাইহাস সালামের জন্য? অবশ্যই পড়তো। কিন্তু তিনি তা না করে, মারঈয়াম আলাইহাস সালামকে ওই অবস্থায়, যখন তিনি প্রসববেদনায় কাতর, তখন বললেন, গাছের ডাল ধরে নাড়া দিতে। কেনো বলেছিলেন? আগেই বলেছি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা চান বান্দা যেন তার নিজের দায়িত্বটুকু, নিজের চেষ্টাটুকু করে, আর বাকিটা আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে দেয়।

শুধু কী নবীদেরই এ আমল ছিল? সাহাবাদের সময়ের দিকে তাকালেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। 
হজরত ফারুকে আজম রাদি. এর একটি ঘটনা হজরত ওমর ফারুক রাদি. একবার সিরিয়া অঞ্চল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি সংবাদ পেলেন, সিরিয়াতে মহামারী ছড়িয়ে পড়ছে। মারাত্মক আকারের মহামারী ছিল। আক্রান্ত লোকেরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুমুখে পতিত হত। হাজার হাজার সাহাবি এই মহামারীতে শহিদ হন। জর্দানে হজরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদি. এর মাজারের পাশে যে বিশাল কবরস্তান রয়েছে, সেই মহামারীতে শহিদ হওয়া শত শত সাহাবির কবর সেখানে আছে। হজরত ওমর ফারুক রাদি. সংবাদ শুনে সঙ্গী সাহাবিদের কাছে পরামর্শ চাইলেন যে, এ অবস্থায় সিরিয়ায় যাওয়া না যাওয়া? 

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আউফ রাদি. একটি হাদিস শোনালেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেন, যদি কোনো এলাকায় মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, যারা ওই এলাকার বাইরে আছে তারা ওই এলাকায় যাবে না এবং যারা ওই এলাকার ভেতরে আছে তারা বাইরে আসবে না। হাদিসটি শুনে হজরত ওমর ফারুক রাদি. বলেন, হাদিস থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে আমাদের সিরিয়াতে এ অবস্থায় যাওয়া উচিত নয়। তিনি সিরিয়াতে যাওয়ার ইচ্ছা মুলতবি করলেন। সঙ্গী সাহাবিদের মধ্যে একজন ছিলেন হজরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদি.। তিনি হজরত ওমর রাদি.- কে বলেন,

أتفرُّ من قدر الله؟

অর্থাৎ, আপনি কি আল্লাহর তাকদির থেকে পলায়ন করছেন? অর্থাৎ যদি আল্লাহ তায়ালা এ মহামারিতে আমাদের মৃত্যু লিখে রেখে থাকেন তা হলে মৃত্যু আমাদের আসবেই। আর যদি তাকদিরে মৃত্যু লিখে রেখে না থাকেন তাহলে সিরিয়াতে যাওয়া এবং না যাওয়া সমান।

উত্তরে হজরত ওমর ফারুক রাদি. বলেন,

لو غيرك قالها يا ابا عبيدة,

অর্থাৎ, আবু উবায়দা, তুমি ছাড়া অন্য কেউ এ কথা বললে মনকে প্রবোধ দিতে পারতাম কিন্তু তুমি এটা কি বলছেন? আমরা কি তাকদির থেকে পলায়ন করছি? এরপর বলেন,

نعم نفر من قدر الله الي قدر الله

অর্থাৎ, হ্যাঁ! আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আরেক তাকদিরের দিকে পলায়ন করছি।

হজরত ওমর রাদি. এর কথার অর্থ ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত ঘটনা ঘটেনি ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদেরকে সর্তকতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সর্তকতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা তাকদিরের বিশ্বাসের পরিপন্থি নয় বরং তাকদিরের বিশ্বাসেরই অংশ। কারণ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম নির্দেশ দিয়েছেন যে, সর্তকতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ কর। এ নির্দেশের ওপর আমল করেই আমরা ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু এতদসত্তেও তাকদিরে যদি আমাদের জন্য মহামারিতে আক্রান্ত হওয়া লেখা থাকে, আমরা তা খন্ডাতে পারব না। কিন্তু আমাদেরকে আমাদের চেষ্টাটা করতে হবে।

ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর